Radium Girl



আপনাকে যদি আমি বলি তেজস্ক্রিয় রেডিয়াম মুখে নিয়ে কাজ করতে হবে তাহলে আপনি নিশ্চয়ই ১০০০ হাত পিছিয়ে যাবেন। আমাকে পাগল ভাববেন অথবা এতক্ষণে আমাকে পাগল ভেবে নিয়েছেন! এটা কখনো সম্ভব নাকি? কারণ আপনি জানেন এই কাজ করা মানে নিজের মৃত্যু নিজে ডেকে আনা। যদি বলি এমন এক সময় ছিলো যখন এই রেডিয়াম মুখে নিয়ে কাজ করতো হাজারো মহিলা। এতক্ষণে নিশ্চয়ই আপনার চক্ষু চড়াক গাছ হয়ে গেছে। হ্যাঁ বলছি রেডিয়াম গার্লদের কথা।১৯২৭ সালের ১৫ই অক্টোবর, শরতের এক সকালে নিউ জার্সির রোজডেল সেমেটেরিতে জড়ো হয়েছেন কিছু মানুষ। সারি সারি সমাধি পেরিয়ে তারা হাজির হলেন একটি বিশেষ সমাধিস্তম্ভের সামনে। সেখানে শায়িত মানুষটির নাম অ্যামিলিয়া মলি ম্যাগিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের রেডিয়াম কর্পোরেশন, United States Radium Corporation (USRC) এর। গত হয়েছেন পাঁচ বছর আগেই। কফিন খুলে সবাই অবাক। তারা দেখতে পেলো মলির নিথর দেহ থেকে মৃদুভাবে আলো বিকিরিত হচ্ছে। সবাই বুঝে গেলো ব্যাপারটা কি? সময়টা বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ। বাজারে এলো এমন এক ঘড়ি যার ডিজিট আর কাটাগুলো রাতে জ্বলতো। এই ঘড়িতে চার্জ দেওয়া লাগতোনা রাতের অন্ধকারে জ্বলজ্বল করতো। ফলে লোকজন একে জাদুর ঘড়ি বলতো। ঘড়িটার এই উজ্জ্বলতার পেছনে ছিলো এক বিশেষ রঙ যা আসতো তেজস্ক্রিয়  রেডিয়াম থেকে। এই ঘড়ির প্রথম উৎপাদন এবং কারখানা স্থাপিত হয় ১৯১৬ সালে নিউ জার্সিতে মাত্র হাতে গোনা ৭০ জন নারী কর্মচারী নিয়ে। পরবর্তীতে যা বেড়ে দাড়াই কয়েক হাজারে আর বাড়ে কারখানার সংখ্যা ও। এই ঘড়ির উৎপাদন কৌশল ছিলো খুবই সূক্ষ্ম। সূচারুভাবে এই কাজটি সম্পন্ন করার জন্য সেই নারী কর্মচারীদের ঐ বিশেষ রঙে ভেজা তুলির শীর্ষ ঠোঁট দিয়ে সূচালো করতে হতো। যার সাথে সাথে তাদের শরীরে যেতে থাকে অল্প অল্প রেডিয়াম। এই থেকে তাদের নামকরণ হয় রেডিয়াম গার্ল নামে। তখনকার সময়ে এই রেডিয়াম গার্লদের মর্যাদা ও বেড়ে গিয়েছিলো বহুগুণ। সমাজে তাদেরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হতো। শুধুই তাই নয় তখনকার মানুষ রেডিয়াম মিশ্রিত পানি পর্যন্ত পান করত বলবর্ধক হিসেবে। নিত্যদিনের প্রসাধনী থেকে শুরু করে প্রায় সবক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হতো রেডিয়াম। অনেক রোগের ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো রেডিয়াম। রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয় বিকিরণ দেখে অনেকেই শরীরে বাড়তি শক্তির জন্য রেডিয়াম গ্রহণ করতো। তবে রেডিয়াম ও ছাড় দেয়নি। তার ভয়ংকর রূপটা সবাই কে ঠিকই দেখিয়ে দিয়েছিল। ১৯৯৮ সালে ম্যারি কুরি রেডিয়াম আবিষ্কার করেন। শরীরে কোষ ধ্বংস করতে পারে বলে অচিরেই একে ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। রেডিয়াম শরীরে ক্যালসিয়াম এর মতো কাজ করে মানে হাড় গঠনে। ফলে রেডিয়াম ও হাড়ে জমা হতো। যার ফলে এর শিকার সবচাইতে বেশি হয়েছিল সেই রেডিয়াম গার্লরা। অচিরেই বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেলো। লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে লাগলো দাতে ব্যাথা, অবসাদ। ১ম মৃত্যুটা ঘটল ১৯২২ সালে ২২ বছর বয়সী রেডিয়াম কন্যা অ্যামিলিয়া মলি ম্যাগিয়া। তার চোয়াল নাকি এতটাই ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছিলো যে ডাক্তার টান দিতেই নাকি খুলে এসেছিলো। অনেকের হাড় এতটাই ভঙ্গুর ছিলো যে ধরলেই খুলে চলে আসতো। আবার অনেকের শরীরের বিভিন্ন স্থানে তীব্র রক্তক্ষরণ এর ফলে মারা যেতো। চারদিক থেকে মৃত্যুর খবর আসতে লাগল। ১৯২৫ সালে গ্রেস ফ্রেইয়ার নামের এক নারী ভাবলেন, এভাবে আর চলতে পারে না। গ্রেস ছিলেন নিউজার্সির সেই প্রথম রেডিয়াম ঘড়ি কোম্পানির একজন কর্মচারী। তিনি মামলা করে দেন কোর্টে।  সারা পৃথিবীতে রেডিয়ামের ভয়াবহতার কথা ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২৮ সালে আদালত রেডিয়াম গার্লদের পক্ষে রায় দেয়। ১৯৬৮ সালের পর রেডিয়াম দ্বারা নির্মিত সকল জিনিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। রেডিয়াম তেজস্ক্রিয়তায় ভুক্তভোগী রেডিয়াম কন্যাদের সঠিক সংখ্যা আজও নির্ধারণ করা যায়নি। ধারণা করা হয়, তাদের সংখ্যা কয়েক হাজারেরও বেশি। রেডিয়ামের অর্ধজীবন প্রায় ১৬০০ বছর, অর্থাৎ প্রায় শত বছর পরও রেডিয়াম কন্যাদের শরীরে আজও রেডিয়াম আছে, থাকবে। কফিনের অন্ধকারে তারা জ্বলতে থাকবেন, আরো বহুকাল ধরে।



#Infinity



Post a comment

0 Comments